কেন গান্ধারী চোখ বেঁধেছিলেন,গান্ধারীর চোখ বাঁধার কারণ
গান্ধারী কেন চোখ বেঁধেছিলেন? হে প্রিয় শ্রোতা, মহাভারতের এমন কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো যতবার শোনা যায়, ততবারই মনে নতুন প্রশ্ন জাগে। আজকের প্রশ্নটিও তেমনই— গান্ধারী কেন নিজের চোখ কাপড় দিয়ে বেঁধেছিলেন? তিনি তো জন্মান্ধ ছিলেন না। তাহলে কেন নিজের ইচ্ছায় সারাজীবনের জন্য পৃথিবীর আলো থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখলেন? এটা কি শুধুই স্বামীর প্রতি ভালোবাসা ও কর্তব্যের প্রতীক ছিল? নাকি এর মধ্যে লুকিয়ে ছিল প্রতিবাদ, অভিমান, ত্যাগ—আর ভবিষ্যতের এক গভীর ট্র্যাজেডির বীজ? আজ আমরা সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজব মহাভারতের কাহিনির আলোকে। গান্ধারী ছিলেন গান্ধার দেশের রাজকন্যা এবং রাজা সুবলের কন্যা। পরবর্তীকালে তাঁর বিবাহ হয় হস্তিনাপুরের রাজপুত্র ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে। কিন্তু এখানে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধৃতরাষ্ট্র জন্ম থেকেই অন্ধ ছিলেন। একজন রাজকন্যার জন্য এমন একজন পুরুষকে স্বামী হিসেবে পাওয়া—যিনি ভবিষ্যতে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকবেন, কিন্তু চোখে দেখতে পাবেন না—এটি সহজ পরিস্থিতি ছিল না। কিন্তু গান্ধারী যখন জানতে পারলেন যে তাঁর স্বামী দৃষ্টিহীন, তখন তিনি একটি অসাধারণ সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি নিজের চোখ কাপড় দিয়ে বেঁধে ফেললেন। ভাবুন তো— যে মানুষটি দেখতে পারেন, সে যদি নিজের ইচ্ছায় সারাজীবন অন্ধের মতো জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তার মনের মধ্যে কতটা শক্তি, ভালোবাসা, অভিমান অথবা সংকল্প থাকতে পারে! গান্ধারীর চোখের বাঁধন তাই শুধু একটি কাপড়ের টুকরো ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের প্রতীক। প্রথম কারণ — স্বামীর দুঃখকে নিজের দুঃখ করা মহাভারতের প্রচলিত ব্যাখ্যায়, গান্ধারী তাঁর স্বামীর সঙ্গে একাত্ম হতে চেয়েছিলেন। ধৃতরাষ্ট্র পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখতে পারেন না। তাই গান্ধারীও সিদ্ধান্ত নিলেন— “যে আলো আমার স্বামী দেখতে পান না, সেই আলো আমি একা উপভোগ করব না।” এখানে আমরা তাঁর দাম্পত্যনিষ্ঠার একটি শক্তিশালী প্রতীক দেখতে পাই। তিনি যেন বলতে চেয়েছিলেন— “তুমি যদি অন্ধকারে থাকো, আমিও তোমার সঙ্গে সেই অন্ধকারেই থাকব।” আজকের ভাষায় এটাকে হয়তো কেউ ভালোবাসা বলবেন, কেউ আত্মত্যাগ বলবেন। কিন্তু গান্ধারীর এই সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল আরও গভীর একটি বিষয়। তিনি নিজের জীবনকে স্বামীর জীবনের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় কারণ — প্রতিবাদের সম্ভাবনা তবে মহাভারতের ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করলে আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গিও সামনে আসে। গান্ধারীর এই চোখ বাঁধাকে কেউ কেউ নীরব প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে দেখেন। কারণ, তাঁর বিবাহের সিদ্ধান্তে তাঁর নিজের ইচ্ছার কতটা ভূমিকা ছিল—এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। রাজপরিবারের বিবাহ অনেক সময় শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকত রাজনীতি, রাজ্য, ক্ষমতা এবং কূটনীতি। গান্ধারী হয়তো উপলব্ধি করেছিলেন— তাঁর জীবন এমন একজন মানুষের সঙ্গে যুক্ত হতে চলেছে, যিনি নিজেই জীবনের আলো থেকে বঞ্চিত। তাই তিনি নিজের চোখ বন্ধ করে যেন পৃথিবীকে একটি নীরব বার্তা দিয়েছিলেন— “আমার স্বামীর ভাগ্য থেকে আমি আলাদা নই।” এই ব্যাখ্যা ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত প্রমাণ নয়, কিন্তু তাঁর চরিত্রের গভীরতা বোঝার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা। তৃতীয় কারণ — ত্যাগ, কিন্তু সেই ত্যাগের মূল্য কী? এখানেই গান্ধারীর চরিত্র সবচেয়ে জটিল হয়ে ওঠে। কারণ ত্যাগ সবসময় যে ভালো ফল নিয়ে আসে, তা নয়। গান্ধারী স্বামীর প্রতি নিজের কর্তব্য পালন করতে গিয়ে নিজের চোখ বন্ধ করেছিলেন। কিন্তু এর ফলে তিনি তাঁর চারপাশের পৃথিবীকে নিজ চোখে দেখার সুযোগ হারালেন। আর শুধু পৃথিবী নয়— নিজের সন্তানদের বড় হয়ে ওঠাও তিনি চোখে দেখতে পারেননি। ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর বহু সন্তান ছিল। তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ছিলেন দুর্যোধন। দুর্যোধনের চরিত্র গঠনের পিছনে ছিল বহু কারণ—রাজনৈতিক পরিবেশ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, শকুনির প্রভাব, পাণ্ডবদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং নিজের অহংকার। কিন্তু প্রশ্ন হলো— গান্ধারী কি তাঁর সন্তানদের ভুলগুলো সময়মতো দেখতে পেরেছিলেন? এখানেই তাঁর চোখের বাঁধন একটি প্রতীকে পরিণত হয়। শুধু শারীরিক চোখ নয়—একজন মায়ের নৈতিক দৃষ্টিও যেন অনেক সময় অন্ধকারে ঢাকা পড়েছিল। গান্ধারী কি দুর্যোধনকে ভালোবাসতেন? অবশ্যই। তিনি একজন মা ছিলেন। দুর্যোধনের অন্যায় তিনি সবসময় সমর্থন করেননি। বরং মহাভারতের বিভিন্ন ঘটনায় দেখা যায়, তিনি দুর্যোধনকে সতর্ক করেছিলেন এবং ধর্মের পথে চলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু মায়ের ভালোবাসা এবং ন্যায়বোধের মধ্যে যখন সংঘর্ষ হয়, তখন পরিস্থিতি কঠিন হয়ে যায়। গান্ধারী নিজের সন্তানকে ভালোবাসতেন। কিন্তু তিনি জানতেন—দুর্যোধনের পথ বিপজ্জনক। তবুও তিনি তাকে পুরোপুরি থামাতে পারেননি। এখানে মহাভারত আমাদের একটি গভীর শিক্ষা দেয়— শুধু ভালোবাসা দিয়ে সন্তানকে রক্ষা করা যায় না। ভালোবাসার সঙ্গে সঠিক শিক্ষা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানও প্রয়োজন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ এবং গান্ধারীর চোখ তারপর আসে কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধ। একদিকে পাণ্ডব। অন্যদিকে কৌরব। ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাই। গুরুদের বিরুদ্ধে শিষ্য। আত্মীয়ের বিরুদ্ধে আত্মীয়। আর সেই যুদ্ধে গান্ধারী হারালেন তাঁর প্রায় সমস্ত সন্তানকে। ভাবুন— যে মা নিজের চোখ বন্ধ করে স্বামীর দুঃখ ভাগ করে নিয়েছিলেন, যুদ্ধের শেষে তাঁর সামনে পড়ে আছে সন্তানদের মৃত্যুর সংবাদ। এখানেই তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়। তিনি সারা জীবন চোখ বেঁধে রেখেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের শেষে যে দৃশ্য তাঁর সামনে এসেছিল, সেটি হয়তো চোখ খোলা মানুষের পক্ষেও সহ্য করা কঠিন। গান্ধারীর অভিশাপ যুদ্ধের পর গান্ধারীর হৃদয়ে জমে থাকা শোক এবং ক্রোধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তিনি শ্রীকৃষ্ণের কাছেও প্রশ্ন তুলেছিলেন—যদি তিনি সবকিছু জানতেন, তাহলে এই ভয়াবহ ধ্বংস কেন ঠেকালেন না? তাঁর সেই শোক ও ক্রোধ থেকেই শ্রীকৃষ্ণের যাদব বংশ ধ্বংসের অভিশাপের কাহিনি মহাভারতে এসেছে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি— গান্ধারীকে